বেকারের চিঠি – মণিভূষণ ভট্টাচার্য

বেকারের চিঠি – কবিতা – মণিভূষণ ভট্টাচার্য । আবৃত্তি সহ

বেকারের চিঠি

কবি - মণিভূষণ ভট্টাচার্য

আমার বয়স যে বছর একুশ পূর্ণ হলো –

ভোট দিলাম।

দ্বিতীয়বার যখন চটের পর্দা-ঢাকা খোপরিতে ঢুকে

প্রগতিশীল প্রতীক চিহ্নে ছাপ মারছি তখন আমি ছাব্বিশ।

ঊনত্রিশ বছর বয়সেও বিশ্বের নিঃস্বতম গণতন্ত্র রক্ষার জন্য

আমার প্রাণ আকুল হয়ে উঠেছিলো।

কিন্তু এ বছর ভোটের দিন সারাদুপুর তক্তপোষে শুয়ে

বেড়ার ফোকর দিয়ে পতাকা-ওড়ানো রিকসার যাতায়াত দেখেছি

কিন্তু ভোট দিতে যাই নি।

 

না, আমি ভোট বয়কট করিনি

ভোট আমাকে বয়কট করেছে।

কারণ আমার বয়স একত্রিশ।

তিরিশের পর সরকারি চাকরি পাওয়া যায় না।

যে সরকার আমাকে চাকরি দেবে না –

সেই সরকার গঠনের জন্য

গায়ে আমার পুলক লাগে চোখে ঘনায় ঘোর –

এরকম আশা করা যায় না।

বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে অবশ্য বয়স পাঁচ বছর শিথিলযোগ্য,

কিন্তু আমার ক্ষেত্রে বিশেষ কারণ

বিশেষভাবেই অনুপস্থিত।

অগত্যা সরকারি চাকরি পাবার একটাই উপায় আছে

সার্টিফিকেট জাল করে বয়স কমিয়ে ফেলা।

কিন্তু হে নন্দিত নেতৃবৃন্দ, যদিও আমার চোখের উপর

আপনাদের অনির্বচনীয় লীলাময় জীবন খোলা আছে

তবু জালিয়াৎ হতে পারবো না –

আমার বাবা সৎ ছিলেন।

 

এই গঞ্জের বাজারে, ন্যাড়া ছাতিমতলায়, কাঁচাপাকা চুলে,

পুরু কাচের চশমা চোখে যে বৃদ্ধটি কুঁজো হয়ে

মান্ধাতার আমলের টাইপরাইটারে

আমার এবং আমার মতো শত শত চাকরিপ্রার্থী এবং

ভোটদাতা অর্থাৎ আপনাদের পরমান্নদাতা যুবকের

হাজার হাজার দরখাস্ত টাইপ ক’রে দিতেন –

একদিন ভরদুপুরে তার বুকের বাঁদিকের লজঝড়ে টাইপমেশিনটা

বিগড়ে গেল।

সেই ফাঁকা জায়গায় আমি কলা নিয়ে বসে পড়লাম।

কার্বাইডে পাকানো চালানী মর্তমান কলার রঙ

যদিও বোম্বাই-অভিনেত্রীর চটককেও হার মানায়,

তবু খেতে অতিশয় অখাদ্য, ফলে আমাকে ডাবের সঙ্গে

ভাব জমাতে হোলো।

 

পা ফাক করে দাঁড়িয়ে ধুতি-পাঞ্জাবী শার্ট-প্যান্ট যখন

সরু নল দিয়ে চোঁ চোঁ করে সুমিষ্ট জল টেনে নিতো,

তাদের দু’পায়ের ফাঁক দিয়ে আমি এই গঞ্জের

ছিন্নবিচ্ছিন্ন মানুষের মর্মান্তিক মহিমাকে স্পর্শ করতাম।

ডাবের খোলাটি ছুঁড়ে দেবার সঙ্গে সঙ্গে, ভিতরে আঙুল ঢুকিয়ে

দেখতাম, অধিকাংশ অমেরুদণ্ডী বুদ্ধিজীবীদের মতোই,

ভিতরে শাঁস আছে কিনা।

 

তারপর চিরুনী ব্লাউজ ধূপকাঠি তরমুজ চাল

হোসিয়ারী মাল এবং ধূর্ত নেতা পূর্তমন্ত্রী হবার জন্য

যত বড় স্বপ্ন দেখে ঠিক সেই আয়তনের মিষ্টি কুমড়ো

অর্থাৎ একের পর এক বহুমুখী বাণিজ্য বিস্তারে আমি

বিড়লাকেও ছাড়িয়ে গেলাম, কিন্তু বেড়ালের ভাগ্যে

শিকে ছিড়লো না। ফলে প্রায় বিনা চিকিৎসায়

মা মারা গেলেন।

 

আমাদের এখানে গত কুড়ি বছরে আধখানা হাসপাতাল

হয়েছে, বাকি আধখানা আর হবে না, কারণ প্রধান রাজনৈতিক

দলের নেতারা অধিকাংশই ডাক্তার এবং তাদের

নার্সিং হোম আছে।

 

রোজ ভোর চারটেয় উঠে আমি যখন বস্তির

গণতান্ত্রিক খাটা পায়খানায় লাইন দিতাম,

মা নিজের – হাতে – দেওয়া ঘুঁটে জ্বালিয়ে চা করে দিতেন।

সেই স্যাঁতসেতে অন্ধকারে ধোঁয়াটে আগুনের সামনে

বসে-থাকা মা- কে আমার ভারতবর্ষ বলে মনে হোতো।

দিদির মৃতদেহ দড়ি কেটে নামাবার পর থেকে

মা একদম চুপ হয়ে গিয়েছিলেন।

যার সঙ্গে দিদির বিয়ে হয়েছিলো সে গরীব ছিলো এবং

ভালো ছিলো। কিন্তু দারিদ্র্য তাকে মহানও করেনি বা

খ্রীষ্ট্রের সম্মানও দেয় নি – এক চোরাকারবারি

শ্রমিকনেতার আড়কাঠিতে পরিণত করেছিলো। সে সেই

নেতাকে মহিলা সরবরাহ করতো –

সেই নেতার সঙ্গে মন্ত্রীর যোগাযোগ ছিলো,

মন্ত্রীর সঙ্গে কেন্দ্রের যোগ ছিলো,

কেন্দ্রের সঙ্গে পরিধির যোগ ছিলো,

পরিধির সঙ্গে ব্যাস এবং ব্যাসের সঙ্গে

ব্যাসার্ধের সংযোগ ছিলো এবং এইসব সূক্ষ্ম যোগাযোগগুলি

একসঙ্গে গিঁট লেগে একটা মোটা নাইলনের দড়ি হয়ে

দিদির গলায় ফাঁস লাগিয়েছিলো।

 

চাকরি আমার হতো।

জেলার সব ছাত্রদের মধ্যে আমি যদি মাতৃভাষায়

প্রথম না হয়ে আপনাদের পিতৃভাষা অর্থাৎ

ইংরেজিতে প্রথম হতাম, হয়তো আমার বরাত

খুলে যেতো। অথবা আমার বন্ধুরা –

যারা ঠিক ঠিক জায়গায় তেল সরবরাহে

আরব রাষ্ট্রগুলিকেও হার মানিয়েছে –

আমি যদি তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায়

নামতে পারতাম তাহলে আমার গলায়

বাদামের ঝুড়ির বদলে নেকটাই ঝুলতো।

 

গর্তে-ঢুকে-যাওয়া ফ্যাকাসে হলুদ রঙের দুটো চোখের

শূন্য দৃষ্টি এবং একটা অকেজো টাইপ মেশিন ছাড়া

বাবা আমার জন্য আর কিছু রেখে যেতে পারেন নি।

এ বছর জীবনের সর্বশেষ ভোটটি দিয়ে মা চলে গেলেন। ভারতবর্ষ পড়ে রইলো।

 

আমার আর কোনো দায় নেই।

যেহেতু আজকের দর্শন আগামীকালের সংস্কার মাত্র

এখন যদি আমি সন্ন্যাসী হয়ে যাই।

বন্ধুরা বলবে, ‘পালিয়ে গেল’।

বিদেশি টাকায় পুষ্ট যে সব তথাকথিত

জনসেবা প্রতিষ্ঠান আছে – তাতে যদি

ভাতের জন্য ঢুকে পড়ি –

তারা বলবে, ‘ব্যাটা গুপ্তচর’।

যদি আত্মহত্যা করি –

তাহলে, ‘কাপুরুষ’।

আর যদি সোজাসুজি প্রতিবাদ করি –

তাহলে আপনারা, রাজনৈতিক নৈশ প্রহরীরা

কালো টাকার কুমিরদের অন্ধকার পাড়ায় গিয়ে

মাঝরাতে ‘নকশাল’ ‘নকশাল’ ব’লে

ঘেউ ঘেউ করে তাদের জাগিয়ে দেবেন

এমন কি অবস্থা তেমন তেমন বেগতিক দেখলে

আপনাদের সঙ্গে রাশিয়া আমেরিকাও যোগ দেবে।

 

এতদিন চাকরি খুঁজেছি। পাই নি।

এবার ভাবছি আমরাই আপনাদের চাকরি দেবো।

 

আমরা যারা বেকার আধাবেকার ভবঘুরে

বাউন্ডুলে ভিখিরি –

যাদের জমি নেই কিন্তু জমিতে খাটে –

বাড়ি বানায় কিন্তু বাড়ি নেই –

যারা শহরে আলো জ্বালে কিন্তু যাদের কুপিতে তেল নেই –

যারা কারখানা বানায়, কিন্তু কারখানা যাদের

আস্তাকুঁড়ে চালান করে দেয়

যারা কোনোদিন একটা ভালো জামা পরেনি,

সরবত খায় নি,

বেড়াতে গিয়ে পর্বতমালার স্তব্ধ নিরাসক্তি ও মহত্ত্বকে

স্পর্শ করেনি,

যারা জন্মায় আর খাটে, খাটে আর মরে,

যারা পিপড়ের মতো পোকামাকড়ের মতো

শীত-রাত্রির ঝরাপাতার মতো –

সেইসব নিরক্ষর নগণ্য কুঁজো অবজ্ঞাত করুণ

যাদের দেখার জন্য এবং ঠকাবার জন্য আপনারা

বিরাট মঞ্চে উঠে দাঁড়ান –

যারা আগামীদিনের ভারতবর্ষের, গোটা পৃথিবীর এবং

সৌরজগতের মালিক – আমি তাদেরই একজন হয়ে

এই জংশনে স্টেশনে বাদাম বেচে যাচ্ছি।

কশাইয়ের বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলের মতো জীবন আমাদের –

যে-কোনো মুহূর্তে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারি – আবার

এই আঙুলের কেন্দ্রীভূত চাপে খোলা ফাটিয়ে বের করে আনা যায়

রাজনৈতিক ক্ষমতার পুষ্টিকর তৈলবীজ, আর সমস্ত শুকনো খোসা

বাতাসে উড়ে যায়, বাতাসের সঙ্গে আকাশ স্পর্শ করে

মানুষের অনন্ত ঘৃণার আগুন –

সেই আগুনের পাশে বসে আছেন আমার মা,

 

আমার দেশজননী।

 

না, ‘বিপ্লব’ শব্দটি শুনলেই আপনাদের মতো

আমার কম্প দিয়ে জ্বর আসে না।

ভাবুক সেই ছেলেটি

ভাবুক সেই ছেলেটি – প্রহ্লাদ কুমার প্রভাস | ছোট গল্প

ভাবুক সেই ছেলেটি রাচনা-প্রহ্লাদ কুমার প্রভাস (P.k) অতি সাধারণ একটি গ্রামের অতি থেকে অতি সাধারণ একটি ছেলে। অতি দরিদ্র ও গরীব পরিবারে তার জন্ম। সবসময়ই

Read More »
মোহাম্মদ জিয়াউল হক এর কবিতা

আমার সেই ফুলওয়ালি – মোহাম্মদ জিয়াউল হক । কবিতা

আমার সেই ফুলওয়ালি কবি- মোহাম্মদ জিয়াউল হক আমি তো ফুলের ঝুরিওয়ালির কথা খুব মনে করে আজও খুঁজি! আমি আজও বিরহ অনলে একাই যুঝি! প্রতিটা প্রভাত!

Read More »
বেকারের চিঠি – মণিভূষণ ভট্টাচার্য

বেকারের চিঠি – কবিতা – মণিভূষণ ভট্টাচার্য । আবৃত্তি সহ

বেকারের চিঠি কবি – মণিভূষণ ভট্টাচার্য আমার বয়স যে বছর একুশ পূর্ণ হলো – ভোট দিলাম। দ্বিতীয়বার যখন চটের পর্দা-ঢাকা খোপরিতে ঢুকে প্রগতিশীল প্রতীক চিহ্নে

Read More »
মোহাম্মদ জিয়াউল হক এর কবিতা

সেই কবে চলে গিয়ে – মোহাম্মদ জিয়াউল হক । কবিতা

সেই কবে চলে গিয়ে কবি – মোহাম্মদ জিয়াউল হক প্রতিদিন এক পথে চলতাম, কত কথা বলতাম, কত কিছু জিজ্ঞাসের জন্য জমা করতাম। জমাকৃত কথাগুলি ছড়াতো

Read More »
কেউ জানেনা আমার কেন এমন হলো

যাতায়াত – কবিতা – কেউ জানে না আমার কেন এমন হলো।  হেলাল হাফিজ । আবৃত্তি সহ

কবি হেলাল হাফিজের কবিতা যাতায়াত । কেউ জানে না আমার কেন এমন হলো। কেউ জানে না আমার কেন এমন হলো। কেন আমার দিন কাটে না রাত

Read More »
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় । আবৃত্তি সহ

আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ এই কী মানুষজন্ম? নাকি শেষ

Read More »
আমি কিংবদন্তির কথা বলছি

আমি কিংবদন্তির কথা বলছি – আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ । আবৃত্তি সহ

আমি কিংবদন্তির কথা বলছি – আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ আমি কিংবদন্তির কথা বলছি  আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি। তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল তাঁর পিঠে রক্তজবার

Read More »
বাতাসে লাশের গন্ধ

বাতাসে লাশের গন্ধ – রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ । আবৃত্তি সহ

বাতাসে লাশের গন্ধ – রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই, আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ননৃত্য দেখি, ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি

Read More »
কান্ডারী হুশিয়ার

কান্ডারী হুশিয়ার – কবি – কাজী নজরুল ইসলাম । আবৃত্তি সহ

কান্ডারী হুশিয়ার – কাজী নজরুল ইসলাম দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি-নিশীথে, যাত্রীরা হুশিয়ার! দুলিতেছে তরি, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ, ছিঁড়িয়াছে পাল,

Read More »
জেলখানার-চিঠি

জেলখানার চিঠি – কবি – নাজিম হিকমত । আবৃত্তি সহ

জেলখানার চিঠি কবি – নাজিম হিকমত, অনুবাদ : সুভাষ মুখোপাধ্যায় ১ প্রিয়তমা আমার তেমার শেষ চিঠিতে তুমি লিখেছ ; মাথা আমার ব্যথায় টন্ টন্ করছে

Read More »
হেলাল হাফিজ

প্রস্থান – কবি – হেলাল হাফিজ । আবৃত্তি সহ

কবি হেলাল হাফিজ এর কবিতা প্রস্থান এখন তুমি কোথায় আছো কেমন আছো, পত্র দিয়ো৷ এক বিকেলে মেলায় কেনা খামখেয়ালী তাল পাখাটা খুব নিশীথে তোমার হাতে

Read More »
হেলাল হাফিজ

নিষিদ্ধ সম্পাদকীয় – কবি – হেলাল হাফিজ । আবৃত্তি সহ

কবি হেলাল হাফিজ এর কবিতা নিষিদ্ধ সম্পাদকীয় এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময় এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময় মিছিলের সব

Read More »
আমি আজ কারও রক্ত চাইতে আসিনি

আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি – কবি – নির্মলেন্দু গুণ

আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি কবি – নির্মলেন্দু গুণ সমবেত সকলের মতো আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালোবাসি, রেসকোর্স পার হয়ে যেতে সেইসব গোলাপের একটি

Read More »

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!